রিয়াদ/তেহরান: হরমুজ প্রণালিতে চলমান উত্তেজনা এবং যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর অবরোধের মুখে সৌদি আরবের সাম্প্রতিক অবস্থান অনেক বিশ্লেষককে চমকে দিয়েছে। দীর্ঘদিনের বৈরিতা কাটিয়ে রিয়াদ কেন এই কৌশলগত জলপথে তেহরানের পক্ষ নিচ্ছে বা অন্তত তাদের ওপর চাপের বিরোধিতা করছে, তার পেছনে রয়েছে গভীর অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা স্বার্থ।
সৌদি আরবের বর্তমান অগ্রাধিকার হলো তাদের অর্থনৈতিক মেগাপ্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন করা। যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান (MBS) ভালো করেই জানেন, ইরানের সাথে কোনো সরাসরি সামরিক সংঘাত শুরু হলে তার কয়েক বিলিয়ন ডলারের 'ভিশন ২০৩০' ও পর্যটন প্রকল্পগুলো ধূলিসাৎ হয়ে যাবে। এই প্রকল্পগুলোর সাফল্যের জন্য অঞ্চলে দীর্ঘমেয়াদী স্থিতিশীলতা অপরিহার্য।
সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর নৌ-অবরোধ আরোপ করার পর ইরান পাল্টা হুমকি দিয়েছে যে, তাদের বন্দরগুলো নিরাপদ না থাকলে উপসাগরীয় কোনো দেশই নিরাপদ থাকবে না। সৌদি আরব মনে করে, ইরানের ওপর অত্যধিক চাপ বাড়ালে ইরান মরিয়া হয়ে পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর তেল অবকাঠামোতে (যেমন: আরামকো) হামলা চালাতে পারে। ২০১৯ সালের হামলার স্মৃতি এখনো রিয়াদের নীতিনির্ধারকদের মনে তাজা।
২০২৫ সালের ইসরায়েলি-মার্কিন হামলার সময় সৌদি আরব তাদের আকাশসীমা ব্যবহার করতে দেয়নি। এর মাধ্যমে রিয়াদ স্পষ্ট করেছে যে, তারা আর কোনো পশ্চিমা শক্তির 'ঢাল' হিসেবে ব্যবহৃত হতে চায় না। তারা এখন চীনের মধ্যস্থতায় শুরু হওয়া ২০২৩ সালের সমঝোতাকে টেকসই করতে চায় এবং আঞ্চলিক সমস্যাগুলো আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করতে আগ্রহী।
হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্বের প্রায় ২০% তেল ও এলএনজি পরিবাহিত হয়। এই পথে উত্তেজনা বাড়লে তেলের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যেতে পারে, যা বিশ্ব অর্থনীতির পাশাপাশি ওপেক প্লাস (OPEC+) এর স্থিতিশীলতার জন্যও হুমকিস্বরূপ। সৌদি আরব চায় না যুদ্ধাবস্থার কারণে তেলের বাজারে কোনো বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হোক।
সৌদি আরব বর্তমানে মাল্টি-পোলার বা বহুমুখী কূটনীতি অনুসরণ করছে। একদিকে তারা যুক্তরাষ্ট্রের সাথে নিরাপত্তা চুক্তি নিয়ে আলোচনা করছে, অন্যদিকে চীন ও ইরানের সাথে সম্পর্ক দৃঢ় করে নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চাচ্ছে। 'ইসলামিক সংহতি'র বার্তা দিয়ে রিয়াদ এখন নিজেকে সমগ্র মুসলিম বিশ্বের এক প্রভাবশালী নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চায়।
সংক্ষেপে: সৌদি আরবের এই অবস্থান ইরানের প্রতি কোনো অন্ধ আনুগত্য নয়, বরং এটি একটি 'প্র্যাগম্যাটিক' বা বাস্তববাদী কৌশল। রিয়াদ বিশ্বাস করে, তেহরানকে কোণঠাসা করার চেয়ে আলোচনার টেবিলে রাখাই তাদের নিজ দেশের নিরাপত্তার জন্য বেশি কার্যকর।
তথ্যসূত্র: আল-জাজিরা, রয়টার্স এবং আন্তর্জাতিক থিঙ্ক-ট্যাংক রিপোর্ট (এপ্রিল ২০২৬)।
হরমুজ প্রণালির এই সংকট যদি আরও দীর্ঘস্থায়ী হয়, তবে কি সৌদি আরব শেষ পর্যন্ত ইরানের সাথে যৌথ নৌ-মহড়ায় অংশ নেবে বলে আপনি মনে করেন?